IQNA

18:37 - December 26, 2018
সংবাদ: 2607618
হযরত ঈসা (আ) এর শুভ জন্মদিন উপলক্ষে আপনাদের প্রতি রইলো আন্তরিক শুভেচ্ছা ও মোবারকবাদ। ২৫ ডিসেম্বর হচ্ছে সহৃদয় ও প্রশান্তির নবী হযরত ঈসা (আ.)-এর পবিত্র জন্মদিন। তাঁর জন্মের ইতিহাস আল্লাহর মহান কুদরতের ক্ষুদ্র একটি নিদর্শন। তাঁর মা ছিলেন হযরত মারিয়াম (আ)। হযরত মারিয়াম ছিলেন হযরত ইমরান (আ.) এর মেয়ে।

বার্তা সংস্থা ইকনা: তিনি তাঁর প্রতিটা মুহূর্ত আল্লাহর ইবাদাতসহ অন্যান্য ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে কাটাতেন। হযরত মরিয়ম আল্লাহর ইবাদত ও ধ্যানে এত মশগুল থাকতেন যে,নিজের খাবারের কথাও ভুলে যেতেন। স্বামীহীন এই মহিয়সী নারীর গর্ভজাত সন্তান ছিলেন হযরত ঈসা (আ)। পবিত্র কুরআনে তাঁকে "রুহুল্লাহ" নামেও উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর শুভ জন্মদিনে আবারও জানাচ্ছি অনেক অনেক শুভ কামনা ও অভিনন্দন।

মারিয়াম (সা.)র অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন হযরত যাকারিয়া (আ.)। তিনি যখনই তাঁর কক্ষে যেতেন,তখনই সেখানে বেহেশতি খাবার দেখতে পেতেন। তিনি এত মর্যাদার অধিকারী ছিলেন যে,নবী-রাসূল না হওয়া সত্ত্বেও তাঁর কথা পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাঁর ইবাদাত কবুল করেছেন এবং আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চার নারীর একজন বলে মনে করতেন। মহিয়সী এই নারীর গর্ভেই জন্ম নেন হযরত ঈসা (আ)। পার্সটুডে

ঈসা (আ) এর কোনো পিতা ছিল না। সে কারণে তাঁর মায়ের প্রতি সন্দেহপূর্ণ দৃষ্টি ছিল তৎকালীন সমাজপতি আর ধর্মপতিদের।কলঙ্কের ওই অভিশাপ মোচন করতে জন্মের পরপরই আল্লাহ রাব্বুল আলামিন হযরত ঈসা (আ.) কে কথা বলার অলৌকিক শক্তি দিয়েছিলেন। একেবারে জন্মের পর থেকেই কথা বলতে শুরু করেছিলেন হযরত ঈসা (আ.)। পবিত্র কুরআনে ঈসা (আ) সম্পর্কে যেসব বর্ণনা পাওয়া যায় সেগুলোই আমাদের কাছে প্রামাণ্য তথ্য হিসেবে গৃহীত হয়েছে। সূরা মারিয়ামের ১৬ থেকে ১৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহপাক বলেছেন:

"হে মুহাম্মদ! এই কিতাবে মারিয়ামের অবস্থা বর্ণনা করুন,যখন সে তার পরিবারের লোকজন থেকে পৃথক হয়ে পূর্বদিকে এক স্থানে আশ্রয় নিল এবং তাদের থেকে নিজেকে আড়াল করার জন্য সে পর্দা করল। এ অবস্থায় আমি তার কাছে নিজের রুহ অর্থাৎ ফেরেশতাকে পাঠালাম এবং সে তার সামনে একটি পূর্ণ মানবাকৃতিতে নিয়ে হাজির হলো। মারিয়াম অকস্মাৎ বলে উঠলো, "তুমি যদি আল্লাহকে ভয় করে থাক তাহলে আমি তোমার হাত থেকে করুণাময়ের আশ্রয় চাচ্ছি।"

মারিয়াম এ কথা বলে আল্লাহর দূতের প্রতিক্রিয়া জানার জন্যে গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার সাথে অপেক্ষা করতে লাগলেন। এ অবস্থা অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। আল্লাহর দূত কথা বলে উঠলেন- 'আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার কাছে এসেছি।'এ কথা শুনে মারিয়ামের অন্তর প্রশান্ত হলো। কিন্তু তারপরই ফেরেশতা বলল- 'আমি এসেছি তোমাকে একটি পবিত্র সন্তান দান করতে।' এ কথা শুনে মারিয়াম অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করলো-'তা কী করে সম্ভব! এখন পর্যন্ত কোনো পুরুষ মানুষ আমাকে স্পর্শ করে নি কিংবা আমি অসতী মেয়েও নই!'

আল্লাহর দূত বলল-'তার মানে হলো,তোমার আল্লাহ বলেছেন,'এটা আমার জন্যে খুবই সহজসাধ্য একটি ব্যাপার। আর এই ঘটনাটাকে আমরা জনগণের জন্যে একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে স্থাপন করব এবং আমাদের পক্ষ থেকে এটি হবে একটা রহমত। এটা একটা অবশ্যম্ভাবী এবং স্থিরীকৃত ব্যাপার।'

মারিয়াম অবশেষে সন্তান সম্ভবা হলেন। যখন প্রসব বেদনা উঠল তখন তিনি উষর জনহীন এক প্রান্তরে একটি শুকনো খুরমা গাছের নীচে গেলেন। বেদনায় আনমনে বললেন-'যদি এর আগে আমার মৃত্যু হতো এবং সবকিছু ভুলে যেতাম।'

অতিরিক্ত কষ্টের মুখে তিনি যখন এসব বলেছিলেন তখন হঠাৎ অলৌকিক শব্দ তাঁর কানে ভেসে এল-'দুশ্চিন্তা করো না! ভালো করে দেখো,তোমার রব তোমার পায়ের নীচে থেকে একটি ঝর্ণাধারা জারি করেছেন। আর তোমার মাথার ওপরে তাকাও। দেখো শুকনো খুরমা গাছে কী সুন্দর খেজুর পেকে আছে। ওই গাছে নাড়া দাও যাতে তরতাজা পাকা খেজুর ঝরে পড়ে। এই সুস্বাদু খেজুর খাও আর ওই নহরের পানি পান করো এবং নবজাতককে দেখে চক্ষু জুড়াও। যখন যেখানেই কোনো মানুষ তোমার কাছে এই সন্তান সম্পর্কে জানতে চাইবে, তুমি কেবল ইশারায় বোঝাবে যে,'আমি আল্লাহর উদ্দেশ্যে রোযা রেখেছি,নীরবতার রোযা,তাই কারো সাথে কথা বলব না।'

আল্লাহর কুদরতে হযরত মারিয়াম মা হলেন। সন্তানের মুখ দেখে মা খুশি হলেন ঠিকই কিন্তু মনে সংশয়-না জানি কে,কী ভাবে! আল্লাহ সেজন্যই তাঁকে জানিয়ে দিলেন, তিনি যেন কারো সাথে কথা না বলেন। আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী মারিয়াম (সা.) পুত্রকে কোলে নিয়ে শহরের দিকে যেতে লাগলেন। মানুষ যখন তাঁর কোলে সন্তান দেখতে পেল,আশ্চর্য হলো। এতদিন যারা মারিয়ামকে একজন পবিত্র ও সচ্চরিত্রবতী এবং তাকওয়াসম্পন্ন বলে মনে করতো,তারা খানিকটা দুশ্চিন্তায় পড়ে গেল।

কেউ কেউ আবার তিরস্কারের সুরে বলতে লাগল: "ছি,ছি! এতো তাকওয়া, এতো পূত-পবিত্রতা। অভিজাত বংশের মুখে চুনকালি পড়ল।" তারা বলল, "হে মরিয়ম! একটা আশ্চর্যময় এবং বাজে কাজ করেছো।"

মারিয়াম আল্লাহর আদেশক্রমে চুপ করে রইলেন। কেবল কোলের সন্তানের প্রতি ইঙ্গিত করলেন। এমন সময় হযরত ঈসা (আ) কথা বলে উঠলেন :

"আমি আল্লাহর বান্দা! তিনি আমাকে ঐশীগ্রন্থ দান করেছেন এবং আমাকে নবী বানিয়েছেন। আমি যেখানেই থাকি না কেন আল্লাহ আমাকে তাঁর বরকতপূর্ণ ও মঙ্গলময় করেছেন। যতোদিন আমি বেঁচে থাকবো ততদিন তিনি আমার প্রতি নামায ও যাকাত আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি মায়ের প্রতি অনুগত থাকার নির্দেশও দিয়েছেন। আমাকে তিনি প্রতিহিংসা পরায়ণ বা অনমনীয় হবার মতো হতভাগ্য বানাননি।

"আমার ওপরে আল্লাহর শান্তি বা সালাম,যেদিন আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং যেদিন আমি মরে যাবো,আবার যেদিন আমি জীবিতাবস্থায় জাগ্রত হবো।"

ঈসা (আ) ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে লাগলেন। সেই ছোটবেলা থেকেই তাঁর ওপর দায়িত্ব বর্তিত হয়েছিল বনী ইসরাঈলকে এক আল্লাহর ইবাদাত বা তৌহিদের পথে আহ্বান জানানোর। তিনি তাঁর নবুয়্যতের প্রমাণ স্বরূপ বহু মোজেযা দেখিয়েছেন। তিনি ভাস্কর্য তৈরীর কাদামাটি দিয়ে পাখি তৈরী করেন এবং তার ভেতর ফুঁ দিলে আল্লাহর আদেশে পাখিটার ভেতর প্রাণের সঞ্চার হয়। প্রাণিত হবার পর মাটি দিয়ে তৈরী পাখিটা উড়ে যায়। তিনি জন্মান্ধ এবং বধিরদেরকে আল্লাহর দেওয়া মোজেযার সাহায্যে সুস্থ করে দিতেন। কুষ্ঠ রোগীরাও তাঁর হাতের ছোঁয়ায় সুস্থ হয়ে যেত। এমনকি মৃতদেরকেও তিনি আল্লাহর দেয়া অলৌকিক শক্তি বলে জীবিত করে দেন।

মহান আল্লাহ তাঁকে তাওরাত,ইঞ্জিল ও বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়ে বনী ইসরাইলীদের কাছে রাসুল হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। সূরা আলে ইমরানের ৪৮ ও ৪৯ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, "ঈসা বলেন, নিশ্চয়ই আমি তোমাদের প্রতিপালকের কাছ থেকে তোমাদের জন্য নিদর্শন এনেছি। আমি কাদা দিয়ে একটি পাখির মূর্তি তৈরী করে,তাতে ফুঁ দেব। ফলে তা আল্লাহর ইচ্ছায় পাখী হয়ে যাবে। আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করব এবং আল্লাহর অনুমতিক্রমে মৃতকে জীবিত করব। তোমরা তোমাদের ঘরে যা খাও এবং জমা কর আমি তাও তোমাদের বলে দেব। তোমরা যদি বিশ্বাসী হও তবে সত্য মেনে নেয়ার ব্যাপারে এতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।"

আল্লাহপাক মানব জাতিকে একত্ববাদের দিকে আহ্বান করার জন্যে যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। নবী-রাসূলগণ আল্লাহর প্রতি মানুষের সম্পর্ক বৃদ্ধির জন্য একত্ববাদের কথা বলতে গিয়ে তাঁরা নানা ধরনের বাধা-বিপত্তি, ভয়-ভীতি,জুলুম নির্যাতন ও জানমালের ক্ষতির শিকার হয়েছেন। হযরত ঈসাও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন না। মানুষের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তাঁকেও ব্যাপক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। অনেক দুঃখ-কষ্ট ও অপমান সহ্য করতে হয়েছে।

হযরত ঈসা (আ.) একাধারে ৩০ বছর আল্লাহর পথে মানুষকে আহ্বান করেন। কিন্তু বনী ইসরাইলের আলেমদের শত্রুতার কারণে জনগণ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা থেকে বিরত ছিল। স্বল্পসংখ্যক লোকজন যারা তাঁর কথায় ঈমান এনেছিল,তাদের অনেককেই শিষ্য হিসেবে মনোনীত করলেন যাতে তারা আল্লাহর পথে বা সত্য দ্বীনের পথে দাওয়াতি কাজে তাঁর সহযোগী হয়। কিন্তু ইহুদিরা ঈসা (আ.) এর সাথে এতো বেশি শত্রুতা করতে লাগলো যে শেষ পর্যন্ত তাঁর ওপর তারা আক্রমণই করে বসে। তারা চেয়েছিল হযরত ঈসা (আ) কে মেরে ফেলতে। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন শত্রুদের অত্যাচার থেকে ঈসা (আ.) কে রক্ষা করলেন। তাঁকে সশরীরে জীবন্ত আসমানে উঠিয়ে নিলেন।

আমাদের এই আলোচনার সকল তথ্যসূত্রই আল-কুরআন। যদিও ঈসা (আ) এর ওপর কিতাব অবতীর্ণ হয়েছিল। কিন্তু সেই কিতাবের বস্তুনিষ্ঠতা এখন প্রশ্নাতীত নয়। সে কারণে আমাদের খ্রিষ্টান ভাই-বোনদের বিশ্বাসে কুরআনের তথ্য অনুযায়ী খানিকটা ব্যতিক্রম রয়েছে।তাদের অনেকেই বিশ্বাস করে ঈসা (আ) মৃত্যুবরণ করেছেন। কিন্তু ইসলামের আদর্শ ও বিশ্বাস অনুযায়ী, ঈসা (আ) বেঁচে আছেন এবং শেষ যামানায় হযরত মাহদি (আ.) যখন আবির্ভূত হবেন তখন তাঁরও আগমন ঘটবে। শুধু তাই নয়,তিনি ইমাম মাহদি (আ)র ইমামতিতে নামাজ পড়বেন এবং বিশ্বব্যাপী শান্তি ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে তাঁকে সহযোগিতা করবেন।

বর্তমান বিশ্বে অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন,সহিংসতা, বর্ণ-বৈষম্য, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে,এখন সময় এসেছে ধর্মের প্রকৃত বাস্তবতা উপলব্ধি করার। আধিপত্যকামী,সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থে ধর্মকে ব্যবহার করলেও তারাই আবার নিজেদেরকে খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারী বলে দাবি করছে। অথচ আজ যদি যিশু খ্রিস্ট বা হযরত ঈসা (আ.) পৃথিবীতে থাকতেন তাহলে তিনি বিশ্বের বলদর্পী ও আধিপত্যকামী শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করতেন এমনকি এক মুহূর্তও অত্যাচারিত জনগোষ্ঠীর মুক্তির জন্য অপেক্ষায় বসে থাকতেন না। আজ যারা নিজেদেরকে খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারী হিসেবে দাবি করছে তাদের উচিত ফিলিস্তিন,ইরাক,সিরিয়া,ইয়েমেন,বাহরাইন,আফগানিস্তানসহ বিশ্বের সকল নির্যাতিত জনপদে শান্তি ফিরিয়ে আনা। আর তাহলেই হযরত ঈসা (আ.) এর জন্মদিন পালন সার্থক হবে।

 

নাম:
ই-মেল:
* আপনার মন্তব্য: